Showing posts with label গৌরবময় অতীত. Show all posts
Showing posts with label গৌরবময় অতীত. Show all posts

Friday, January 3, 2020

এক অপরিচিত সেলিব্রিটি - ৪

 بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ

শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু 


সুমাইয়া বিনতে খাইয়াত -  এই শক্তিশালী নারী ইসলামে প্রথম শহীদ বলে ভূষিত


নারীকে যোগ্য সম্মান দিতে আজও কুন্ঠা বোধ করে আমাদের সমাজ, সংসার। ইসলাম গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে একজন নারীকেই আমরা দেখি। যিনি ছিলেন রাসূল (ﷺ)এর প্রিয় সহধর্মিনী হযরত খাদিজা (রাযি.)। তেমনি, নিজের ঈমান রক্ষা করতে গিয়ে প্রথম যিনি শহীদ হয়েছিলেন, তিনিও ছিলেন একজন নারী- হযরত সুমাইয়া (রাযি.)।

সুমাইয়া বিনতে খাব্বাত বা সুমাইয়া বিনতে খাইয়াত হলেন ইসলামিক ঐতিহ্য অনুসারে হিজরত পূর্ব সময়ের প্রথম শহীদ সাহাবী এবং মহিলা যিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার কারণে আবু জাহলের হাতে নিহত হন। তিনি ইয়াসির ইবনে আমিরের স্ত্রী এবং আম্মার ইবনে ইয়াসিরের মাতা ছিলেন, যারা প্রাথমিক মুসলিম ধর্মান্তরিতদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন।



ইসলামের প্রথম শহীদ হযরত সুমাইয়া (রাযি.)এর জন্ম হয়েছিল তৎকালীন আরবের নিম্নগোত্রের পরিবারে। যাদেরকে দাস অথবা দাসির কাজ করতে হতো। অভিজাত বংশের প্রভাব বা ছায়া তাঁর মাথার উপর ছিল না। রাসূল (ﷺ) দ্বীন ইসলাম প্রচার করার সাথে সাথে হযরত সুমাইয়া (রাযি.) ও তাঁর স্বামী এবং ছেলেরাও মুসলমান হয়ে যান।

Friday, December 20, 2019

এক অপরিচিত সেলিব্রিটি - ৩

 بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ

শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু 



মধ্যযুগীয় ভারতবর্ষের সঙ্গে পশ্চিমী পণ্ডিতদের কে আলাপ করিয়েছে জানেন?

আল বিরুনি : এক অপরিচিত সেলিব্রিটি 


আবু রায়হান আল বিরুনি বা আবু রায়হান মোহাম্মদ ইবনে আহমদ আল বিরুনি (৯৭৩-১০৪৮), ছিলেন মধ্যযুগের বিশ্বখ্যাত আরবীয় শিক্ষাবিদ ও গবেষক। তিনি অত্যন্ত মৌলিক ও গভীর চিন্তাধারার অধিকারী ছিলেন। তাঁর পূর্ণ নাম আবু রায়হান মুহাম্মাদ ইবনে আহমাদ আল-বিরুনি। তিনি জন্ম নিয়েছিলেন ৩৬২ হিজরির ৩ জিলহজ মোতাবেক খ্রিস্টিয় ৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রাচীন ইরানের খারেজম প্রদেশের কাস শহরে। বর্তমানে এ অঞ্চলটি মূলত উজবেকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের অংশ।


বলা হয় গজনীর সুলতান মাহমুদ ভারতে হামলার সময় আল  বিরুনিকে নিজ সেনাদলের সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। এইসব সফরে বিরুনি ভারতীয় পণ্ডিতদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন বা তাদের সম্পর্কে জানতে পারেন।  বিরুনি বেশ কয়েক বছর বা অন্তত এক যুগের এক বড় অংশ ব্যয় করেছেন ভারত সম্পর্কিত গবেষণায়। এ সময় তিনি সংস্কৃত সহ ভারতের নানা ভাষাও রপ্ত করেন। এ ছাড়াও এ সময় দর্শনসহ ভারতীয়দের নানা জ্ঞান সম্পর্কে দক্ষতা অর্জন করেন বিরুনি।

Thursday, November 28, 2019

ইসলামিক মুদ্রা

 بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ

শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু 


কবে থেকে চালু হয় ইসলামিক মুদ্রা? কেই বা প্রবর্তক?



পণ্যবিনিময় ব্যবস্থার আদিমতম মাধ্যম হিসেবে অর্থের লেনদেন সেই পুরাকাল থেকেই চলে আসছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির মধ্যেও এর কোনো বিকল্প ছিল না। মুসলিমরা ব্যবসা-বাণিজ্যে অন্যদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়েই উন্নতি করেছিল সেই সময়। সেই সময়কার মুসলিম সাম্রাজ্যগুলির লেনদেন নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন এখনও অনেকের কাছে অজানা। 

মুহাম্মদ (সা:)-এর সময় বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য ও পারস্য সাম্রাজ্যের শাসনব্যবস্থা ও জীবন ধারণের সাথে আরবের দেশগুলির সমাজ ব্যবস্থায় পার্থক্য ছিল। ওই সাম্রাজ্যগুলি চলত সম্রাটের অধীনে এবং সম্রাট শেষ কথা বলতেন। কিন্তু আরবে ছিল উপজাতি ব্যবস্থা, উপজাতিদের মধ্যেই একরকম গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নেতা নির্বাচিত হতেন। 


আরবের সওদাগররা পণ্য নিয়ে সারিসারি উটে চাপিয়ে যেত ব্যবসা করতে। এই পণ্যের মধ্যে থাকত ধূপধুনো, আতর, মশলা, হাতির দাঁত, মুক্তো ইত্যাদি। এর মধ্যে বেশ কিছু জিনিস ছিল যেমন ধুনো বা গন্ধরস, এগুলি শুধু আরবেই পাওয়া যেত সেইসময়।  তাই এর চাহিদাও ছিল প্রচুর। 

Friday, December 16, 2016

এক অপরিচিত সেলিব্রিটি - ২


 بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ

              শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু 

মুসলিমরা যখন মিশরের আলেক্সান্দ্রিয়া জয় করতে যায় তখন সেখানে গিয়ে দেখে মিশরের সেনাবাহিনী সংখ্যায় মুসলিমদের চেয়ে অনেক বেশী। মুসলিমরা ছিলেন মাত্র ৪০০০। তাই আমর বিন আস (রা) খলিফা ঊমার (রা) কে চিঠি দিয়ে আরও সৈন্য চেয়ে পাঠালেন। ঊমার (রা) ৪০০০ সৈন্য ঠিক করলেন এবং এই ৪০০০ এর সাথে আরও ৪ জনকে যুক্ত করে মোট ৪০০৪ জনকে পাঠালেন। তিনি আমর বিন আস(রা) কে চিঠি লিখে বললেন, "আমি ৪০০০ সৈন্য পাঠালাম আর সাথে দিলাম ৪ জন। এই ৪ জনের প্রত্যেকে ১০০০ জনের সমান। অর্থাৎ আমি মোট ৮০০০ সৈন্য পাঠালাম। তোমার সাথে আছে ৪০০০; ১২০০০ মুসলিম সেনাবাহিনীকে পরাজিত করার ক্ষমতা অবিশ্বাসীদের নেই।" এই ৪ জন হলেন- যুবায়ের বিন আওয়াম, মিকদাদ বিন আসওয়াদ, উবাদাহ বিন সামিত এবং মাসলামাহ বিন মাখলাদ (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)

Tuesday, August 12, 2014

একজন অপরিচিত সেলিব্রিটি (ওয়াইস আল কারনি)

একজন অপরিচিত সেলিব্রিটি (ওয়াইস আল কারনি)
...................................................................................................................

আমিরুল মুমিনিন ওমর বিন খাত্তাব (রাঃ) দাঁড়িয়ে আছেন ইয়েমেন থেকে আগত দলটির সামনে। এই দলটি ইয়েমেন থেকে মদিনা হয়ে যাবে ইরাক ও আশ-শাম-এর দিকে। ওমর (রাঃ) তাদেরকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করলেনঃ “ হে ইয়েমেনবাসী!! তোমাদের মধ্যে কি এমন কেউ আছ যার নাম ওয়াইস।”

প্রশ্নটি করে ওমর(রাঃ) অপেক্ষা করছেন। অনেক দিন থেকেই ইয়েমেনের এই ব্যক্তিটিকে খুঁজছেন তিনি, প্রতিবারই ইয়েমেন থেকে কোনো কাফেলা আসলে ওমর (রাঃ) তাদেরকে ওয়াইস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। কিন্তু এই ব্যক্তি সম্পর্কে কেউ কোনো তথ্য দিতে পারে না। প্রতিবারই তাঁকে হতাশ হতে হয়। 

আজকে অবশ্য খলিফা ওমর (রাঃ)-এর প্রশ্ন শুনে একজন দাঁড়ালেন। বয়সে বৃদ্ধ , বিশাল দাঁড়ি। তিনি ওমর (রাঃ)কে উদ্দেশ্য করে বললেনঃ “ আপনি কোন ওয়াইস এর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছেন সেটা তো জানি না, তবে আমার ভাই-এর ছেলের নাম ওয়াইস। কিন্তু তার ব্যাপারে তো জিজ্ঞেস করার প্রশ্নই আসে না, সে তো এমন কেউ না; বরং সে এতোই গরিব এবং এতোই নতমস্তক যে, আপনার পরিচিত হওয়ার প্রশ্নই আসে না। সে আমাদের উটগুলোর দেখাশোনা করে। এমনকি আমাদের মধ্যেও তার কোন বিশেষ স্থান নেই।” 

বৃদ্ধের কাছে ওমর (রাঃ) ওয়াইস সম্পর্কে আরও জানতে চাইলেন। 

বৃদ্ধ বললঃ হে আমিরুল মুমিনিন! কেন আপনি তার সম্পর্কে জানতে চাচ্ছেন? আল্লাহর কসম, তার মতো এতো বোকা আর এতো হতদরিদ্র আমাদের মধ্যে আর কেউ নেই।

বৃদ্ধের এই কথা শুনে ওমর (রাঃ) তার চোখের পানি আটকাতে পারলেন না। অঝোরে কেঁদে দিলেন। তার কান্না গোপন রইলো না। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেনঃ “ তুমি হত দরিদ্র - সে না । কারণ আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি যে, ‘রাবিইয়া’ আর ‘মুজার’ গোত্রের লোক সংখ্যার মতো মানুষকে আল্লাহ ওয়াইস-এর সুপারিশের উসিলায় মাফ করে দেবেন এবং জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।এখন আমাকে বল, কোথায় সে?” বৃদ্ধ বললঃ আরাফা’র চূড়ায় আছে সে। ওমর (রাঃ) আলী (রাঃ)কে নিয়ে দ্রুত আরাফায় গেলেন। ঐ তো একটা গাছের নিচে বসে ইবাদত করছেন ওয়াইস, তার চারপাশে অনেক উট। ওমর (রাঃ) এবং আলী (রাঃ) তাঁর সামনে গেলেন, তাকে উদ্দেশ্য করে বললেনঃ আসসালামু ওয়ালাইকুম।

ওয়াইস তাঁর ইবাদত শেষ করে তাঁদের দিকে ফিরে সালামের উত্তর দিলেন।

তাঁরা তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ কে তুমি?

সে বললঃ আমি উট দেখাশোনা করি এবং একটি গোত্রের কাজের লোক।

তাঁরা বললেনঃ আমরা তোমাকে তোমার পশু পালনের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করিনি, এমনকি তুমি কোনো গোত্রের কাজের লোক কিনা তাও জানতে চাইনি; আমরা জানতে চাচ্ছি তোমার নাম কী? 

সে বললঃ আব্দুল্লাহ (আল্লাহর বান্দা)।

তাঁরা বললেনঃ এই আসমান এবং জমিনে যতো আল্লাহর সৃষ্টি আছে সবই আল্লাহর বান্দা; কিন্তু তোমার নাম কী যা দিয়ে তোমার মা তোমাকে সম্বোধন করেন?

সে বললঃ তোমরা আমার কাছে কী চাও? 

তাঁরা বললেনঃ “ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার আমাদেরকে ওয়াইস আল কারনি নামে এক ব্যক্তির কথা বলেছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী সেই ব্যক্তির থাকবে নীলাভ কালো চোখ এবং তার বাম কাঁধের নিচে এক দিরহামের মতো একটি সাদা দাগ থাকবে। তাই দয়া করে আমাদেরকে দেখতে দাও যে তোমার ঐ সাদা দাগটি আছে কিনা। তাহলেই আমরা বুঝবো আমরা যাকে খুঁজছি সে তুমি কি না?
ওয়াইস তখন তার বাম কাঁধ উন্মুক্ত করে দেখালেন, দিরহামের মতো সেই সাদা দাগটি স্পষ্ট ফুটে আছে তার বাম কাঁধের নিচে। ওমর (রাঃ) এবং আলী (রাঃ)-র বুঝতে অসুবিধা হলো না যে এই সেই ওয়াইস আল কারনি যার কথা অনেক অনেক বছর আগে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বলেছিলেন।

তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবিত। তিনি একটি হাদিসে কুদসি বর্ণনা করেছিলেন (আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্নিত হয়েছে হাসিদটি) যেখানে তিনি বলেন যে, আল্লাহ বলেনঃ “আল্লাহ সুবহানাহুওয়াতালা ভালোবাসেন তাঁর সৃষ্টিকে যে আল্লাহ ভীরু, যার অন্তর পরিশুদ্ধ, তাদেরকে যারা নিজেদের গোপন রাখে এবং তাদেরকে যারা নিরপরাধ, যার মুখমন্ডল ধূলো-মলিন, যার চুল এলোমেলো, যার পেট খালি এবং সে যদি শাসকের সাথে দেখা করার অনুমতি চায় তাহলে তাকে তা দেয়া হয় না। এবং সে যদি একটু সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়ে বিয়ে করতে চায় তাহলে তাকে ফিরিয়ে দেয়া হয় এবং সে যদি দুনিয়ার কিছু ত্যাগ করে এর অভাব কখনোওই সে বোধ করে না। এবং সে যদি কোথাও থেকে বের হয়ে যায় তাহলে তার বের হয়ে যাওয়াও কেউ লক্ষ্য করে না। সে যদি অসুস্থ হয়, তাহলে তাকে দেখতে কেউ আসে না এবং সে যদি মারা যায় তাহলে তাকে কবর পর্যন্ত পৌঁছে দিতেও কেউ আসে না।”

এই হাদিস শুনে সাহাবারা (রাঃ) তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ 

“ইয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, এরকম একজন ব্যক্তিকে আমরা কিভাবে খুঁজে পাবো?

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেনঃ ওয়াইস আল কারনি হচ্ছে এমনই একজন ব্যক্তি।

তখন সাহাবারা (রা) জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ কে এই ওয়াইস আল কারনি?

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেনঃ তার গাত্র বর্ণ কালো, কাঁধ প্রশস্থ, উচ্চতা মাঝারি, তার দাঁড়ি তার বুক পর্যন্ত লম্বা, তার চোখ সবসময় অবনমিত থাকে সেজদার স্থানে। তার ডান হাত থাকে তার বাম হাতের ওপর। সে একান্তে এমনভাবেই কাঁদে যে তার ঠোঁট স্ফীত হয়ে যায়। সে একটি উলের পোশাক পরে এবং আসমানের সবাই তাকে চেনে। যদি সে আল্লাহর নামে কোনো শপথ করে, সে তা পালন করে। তার ডান কাঁধের নিচে একটি সাদা দাগ রয়েছে। যখন আখেরাতের দিন আসবে এবং আল্লাহর বান্দাদেরকে বলা হবে জান্নাতে প্রবেশ কর, তখন ওয়াইসকে বলা হবে ‘দাঁড়াও এবং সুপারিশ কর’ আল্লাহ সুবহানাহুওয়াতালা তখন তার সুপারিশ অনুযায়ী ‘মুজির’ এবং ‘রাবিয়া’ (ওয়াইসের দুই গোত্রের নাম) গোত্রের লোক সংখ্যার সমান লোককে ক্ষমা করে দেবেন । সুতরাং হে ওমর এবং আলী, তোমরা যদি কখনও তার দেখা পাও তাহলে তাকে বলো তোমাদের জন্যে আল্লাহর কাছে সুপারিশ করতে, তাহলে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করবেন।”

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওয়াইস সম্পর্কে আরো বলেছিলেন যে, তার ঘরে বৃদ্ধা মা আছে। যার পুরো দেখা শোনা ওয়াইস করেন এবং বৃদ্ধা মাকে দেখা শোনার জন্যে সে ইসলাম ধর্ম গ্রহনের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে দেখা হওয়ার যে সুবর্ণ সুযোগ ছিল তা গ্রহন করতে পারেনি। 

(ওয়াইস আল কারনি তার মায়ের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ(সাঃ)এর সাহাবি হওয়ার মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হন। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবদ্দশায় ইসলাম কবুল করলেও তিনি তাবেয়ি রয়ে যান।)  

এই ঘটনার পর প্রায় দশ বছর কেটে গেছে।রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আর তাদের মাঝে নেই। আবু বকর (রাঃ)ও দুনিয়া ছেড়েছেন। এর মধ্যে শত খোঁজার পরও ওয়াইস আল কারনিকে খুঁজে পাননি তাঁরা। আর আজকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বর্ণনাকৃত সেই ওয়াইস আল কারনি তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।

ওমর (রাঃ) এবং আলী (রাঃ) ওয়াইস আল কারনিকে জড়িয়ে ধরে বললেনঃ “আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তুমিই সেই ওয়াইস আল কারনি। সুতরাং আল্লাহর কাছে আমাদের জন্যে ক্ষমার সুপারিশ কর এবং আল্লাহ তোমাকেও ক্ষমা করুন।”

উত্তরে ওয়াইস বললেনঃ কোনো আদম সন্তান বা নিজেকে আমি ক্ষমা করানোর ক্ষমতা রাখি না , তবে এই জমিনে ইমানদার পুরুষ এবং ইমানদার নারী রয়েছে, মুসলিম নারী মুসলিম পুরুষ রয়েছে, যাদের দোয়া আল্লাহর দরবারে কবুল হয়। 

তাঁরা বললেনঃ সত্যিই তাই।

তখন তিনি বললেনঃ আপনারা দুজন আমার সম্পর্কে জানেন এবং আমি আমার অবস্থান সম্পর্কে জানি কিন্তু আপনারা কারা?

আলী (রাঃ) তখন ওমর (রাঃ)কে দেখিয়ে বললেনঃ ইনি হচ্ছেন আমিরুল মুমিনিন ওমর বিন খাত্তাব (রাঃ) এবং আমি হচ্ছি আলী বিন আবু তালিব।

ওয়াইস তাদের পরিচয় শুনে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন এবং তাদের উদ্দেশ্য করে বললেনঃ আসসালামু ওয়ালাইকুম ইয়া আমিরুল মুমিনিন এবং আলী আপনাকেও। আল্লাহ আপনাদেরকে এই উম্মাহর জন্যে উত্তম প্রতিদান দান করুন।

তাঁরাও বললেনঃ আল্লাহ তোমাকেও উত্তম প্রতিদান দিন।

এর পর ওয়াইস আল কারনি তাদের জন্যে দোয়া করলেন।

ওমর (রাঃ) ওয়াইস আল কারনিকে বললেনঃ “ তুমি এখন ইহজীবন এবং পরকালে আমার বন্ধু।”

ওয়াইস আল কারনি জানেন ইহজীবনে ওমরের বন্ধু হওয়া মানে সুনাম এবং একটি স্বচ্ছল জীবন, তাই তিনি ওমর (রাঃ)এর বন্ধুত্ব তো গ্রহন করলেন কিন্তু খুব বিনয়ের সাথে তার সাথের স্বচ্ছলতা এবং সুনাম যা ওমর (রাঃ) এর মাধ্যমে সে পেতে পারত, সেটা প্রত্যাখ্যান করলেন। তিনি যেমন আছেন ঠিক তেমনই থাকার ইচ্ছে পোষণ করলেন। 

ওমর (রাঃ) বলেনঃ তুমি কোথায় যেতে চাও এখন? ওয়াইস আল কারনি বলেনঃ ইরাকের কুফায়।

ওমর(রাঃ): ঠিক আছে আমি একটি চিঠি লিখে দেই কুফার গভর্নরকে যাতে সে তোমার ভালো দেখাশোনা করতে পারে। 

ওয়াইস বললেনঃ দয়া করে এই কাজ করবেন না। কারণ আমি নিজেকে এইভাবে অচেনা রাখতেই পছন্দ করি। আমি আল্লাহর রাস্তায় এভাবেই অপরিচিত হয়েই থাকতে চাই।

এরপর সে কুফায় চলে যায়। সেখানেই বসতি স্থাপন করে। এইভাবে কেটে যায় আরও কিছু বছর। একবার কুফা থেকে ওয়াইস আল কারনির গোত্রের এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি মদিনায় আসেন। তার কাছে ওমর(রাঃ) ওয়াইস আল কারনি কেমন আছেন তা জানতে চান। খলিফা ওয়াইস আল কারনির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করছে দেখে সেই ব্যক্তি খুব অবাক হয় , সে খালিফা ওমর (রাঃ)কে উদ্দেশ্য করে বলেঃ আমি তাকে দরিদ্রতায় নিমজ্জিত দেখে এসেছি্‌ ,তার ঘরে কোনো আসবাব নেই, কেন আপনি এই ব্যক্তির কথা জিজ্ঞেস করছেন।

ওমর (রাঃ) এই ব্যক্তিকে বললেনঃ যদি তুমি তার দেখা পাও , তাকে বলো তোমার জন্যে দোয়া করতে কারণ রাসুলুল্লাহ (সাঃ) তার কথা বলেছিলেন। 

সেই ব্যক্তি কুফায় ফিরে ওয়াইসের সাথে দেখা করে। তাকে বলেঃ ওয়াইস আমার জন্যে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর।

ওয়াইস বললেনঃ তুমি নিজে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। কারণ তুমি মাত্র সফর করে আসলে। আর মুসাফিরের দোয়া আল্লাহ কবুল করেন।

সে বললঃ না না। আমি চাই তুমি আমার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা কর।

ওয়াইস আল কারনি একটু চুপ থাকলেন তারপর বললেনঃ“তোমার কি ওমরের সাথে দেখা হয়ে ছিল?”

সে বললঃ হ্যাঁ।

ওয়াইস আল কারনি বুঝতে পারলেন কী হয়েছে ব্যাপারটা। তিনি কিছু বললেন না। ঐ ব্যক্তির জন্যে দোয়া করলেন।

এই ঘটনা পুরো কুফায় আগুনের মত ছড়িয়ে পড়ল , সবাই জেনে গেল ওয়াইস আল কারনি সম্পর্কে । নিজেদের আল্লাহর দরবারে মাফ করিয়ে নিতে মানুষজন যখন ওয়াইসের খোঁজে তার বাড়ি গেল , দেখলো বাড়ি খালি পড়ে আছে-ওয়াইস নেই। নাম, যশ, খ্যাতি সব কিছু দুহাত দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে একমাত্র আল্লাহর জন্যে বেঁচেছেন তিনি। তার তাকওয়া, তার মর্যাদা তিনি কারো কাছে প্রকাশ করতে চাননি। একমাত্র আল্লাহর জন্যেই সব করেছেন এবং আল্লাহর কাছ থেকেই ইনশাআল্লাহ তিনি এর বিনিময় পাবেন, সত্যি ওয়াইস আল কারনি একজন অপরিচিত সেলিব্রিটি।

আল্লাহ আমাদের সকল কথা এবং কাজকে সঠিক ইখলাসের চাদর দিয়ে ঢেকে দিন। আমিন।



Wednesday, July 17, 2013

মুসলিম বিজ্ঞানীদের সংক্ষিপ্ত জীবনী-১ | ইবনুন নাফিস

পূর্বকথা:

মুসলমানদের আলসেমি, বিলাসিতা আর জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি অবহেলার কারনে আজ বিশ্ববিখ্যাত বৈজ্ঞানিক ও মনিষীদের নাম বিকৃতরুপে আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে। যেসব মুসলিম বিজ্ঞানী বিজ্ঞানের অনেক মৌলিক সূত্র আবিস্কার করেছিলেন, যাঁদের আবিস্কারের ফলে বর্তমান বিজ্ঞান হয়েছে পরিপূর্ণ তাঁদের আমরা ভুলতে বসেছি। পাঠ্যবইয়ের কল্যাণে খুব কম মুসলিম বিজ্ঞানীর নাম জানি আমরা। আজ আমরা পরিচিত হব- ইবনুন নাফিস এর সাথে। অনেকেই শুনেছি, আবার অনেকেই শুনিনি, জানি না তাঁর অবদানের ব্যাপারে। কি করেছিলেন এই মুসলিম বিজ্ঞানী, চলুন ইতিহাসের পাতা হতে একটু দেখে নেয়া যাক।


ইবনুন নাফিস   

একাধিক সোর্সমতে তাঁর নাম পেয়েছি ইবনুন নাফিস। আবার উইকিপিডিয়া বলছে তাঁর নাম ইবনে আল-নাফিস। যেহেতু তিনি আরব ছিলেন সেই অনুযায়ী, এই বিজ্ঞানীর একটা বিশাল টাইপের নাম আছে। "আলা-আল-দিন আবু আল-হাসান আলী ইবনে আবি-হাজম আল-কারশি আল-দিমাস্কি"। 

১২০৮ (মতান্তরে ১২১৩) খ্রিস্টাব্দে ইবনুন নাফিস সিরিয়ার দামেস্ক শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মস্থান নিয়েও রয়েছে মতপার্থক্য, তাঁর জন্মস্থান সিরিয়া না মিশরে এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে।  


                                                   


মানবদেহে বায়ু ও রক্ত সঞ্চালনের ব্যবস্থা আবিস্কারের জন্য বিখ্যাত ছিলেন ইবনুন নাফিস। ইবনুন নাফিস মানবদেহে রক্তসঞ্চালন পদ্ধতি, ফুসফুসের সথিক গঠন পদ্ধতি, শ্বাসনালী, হৃদপিন্ড, শরীরে শিরা উপশিরায় বায়ু ও রক্তের প্রবাহ ইত্যাদি সম্পর্কে বিশ্বের জ্ঞানভান্ডারকে অবহিত করেন। 
শ্বাসনালির অভ্যন্তরীণ অবস্থা কি? মানবদেহে বায়ু ও রক্তপ্রবাহের মধ্যে ক্রিয়া-প্রক্রিয়ার ব্যাপারটা কি? ফুসফুসের নির্মাণ কৌশল কে সভ্যজগতকে সর্বপ্রথম অবগত করিয়েছিলেন? রক্ত চলাচল সম্বন্ধে তৎকালীন প্রচলিত গ্যালেনের মতবাদকে ভুল প্রমাণিত করে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ১৩০০ শতাব্দীতে বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন কে? এসব জিজ্ঞাসার জবাবে যে মুসলিম মনীষীর নাম উচ্চারিত হবে তিনি হচ্ছেন ইবনুন নাফিস। 

তিনি পরিষ্কারভাবে বলেছেন যে-

শিরার রক্ত এর দৃশ্য বা অদৃশ্য ছিদ্র দিয়ে ডান দিক থেকে বাম দিকের হৃৎকোষ্টে চলাচল করে না বরং শিরার রক্ত সব সময়ই ধমনী শিরার ভেতর দিয়ে ফুসফুসে গিয়ে পৌঁছায়; সেখানে বাতাসের সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে শিরার ধমনীর মধ্য দিয়ে বাম দিকের হৃৎকোষ্টে যায় এবং সেখানে এ জীবন তেজ গঠন করে।

তিনি প্রমাণ করেন যে হৃৎপিন্ডে মাত্র দুটি প্রকোষ্ট রয়েছে।
আল-শামিল ফি আল-তিব্ব নামের ৩০০ খণ্ডের এক বিশাল বই লিখেছিলেন তিনি। এই বইয়ের পাণ্ডুলিপি বর্তমানে দামেস্কে সংরক্ষিত আছে। তাঁর অন্যান্য বিখ্যাত বইগুলো হল- মুয়াজ আক-কানুন, আল-মুখতার ফি আল-আঘধিয়া।

১২৩৬ সালে নাফিস মিশর গমন করেন। সেখানে আল-নাসরি নামক হাসপাতালে তিনি চিকিৎসা করতেন। পরবর্তীতে আল-মুনসুরী হাসপাতালে তিনি প্রধান চিকিৎসক এবং সুলতানের ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগ পান। 

মুসলিম এই মহামনিষী ১২৮৮খ্রিস্টাব্দের ১৮ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজেউন। তিনি তাঁর বাড়ি, লাইব্রেরী, হাসপাতাল সব আল- মনসুরী হাসপাতালকে দান করে যান।   

বর্তমান চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী ইবনুন নাফিসের মতবাদট সম্পূর্ণ বিজ্ঞানসম্মত বলে গৃহীত হলেও তাঁকে পাশ্চাত্য চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বিজ্ঞান জগতে স্বীকৃতি দেয়নি। তাঁর এই যুগান্তকরী আবিস্কার ৭০০ বছরের জন্য হারিয়ে গিয়েছিল। মানুষ ভুলে গিয়েছিল তাঁর এই অবদানের কথা। অবশেষে ১৯২৪ সালে হঠাৎ করেই বার্লিনের একটি লাইব্রেরীতে তাঁর লেখা একটি পাণ্ডুলিপি (সিয়ারাহ তাসরিহ আল-কুনুন) পাওয়া যায় এবং বিশ্ববাসী আবিষ্কারটি জানতে পারে। 


রেফারেন্সঃ

১) উইকিপিডিয়া               

৩) ইন্টারনেট 


ছবি- উইকিপিডিয়া